মুখবন্ধের বিকল্প
একদা প্রাচ্যের এক প্রাজ্ঞ শাসক পৃথিবীবাসী সব মানুষের সম্পূর্ণ বিবরণ জানতে চান। তিনি তাঁর উজিরদের তলব করে বলেন, ‘আমার জন্য পৃথিবীর সব জাতির একটি ইতিহাস রচনার ব্যবস্থা করুন। আমি জানতে চাই, তারা আগে কেমন ছিল আর এখন কেমন আছে। তারা কী করে, কোন কোন যুদ্ধ করেছে এবং এখন করছে। আর বিভিন্ন দেশে কী কী শিল্পবাণিজ্য ও সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে।’
এ জন্য তিনি সময় বরাদ্দ করেন পাঁচ বছর। উজিররা নীরবে কুর্নিশ সেরে বিদায় নিলেন। অতঃপর তাঁরা রাজ্যের প্রাজ্ঞতম ব্যক্তিদের আহ্বান করলেন ও তাঁদের শাসকের ইচ্ছার কথা জানালেন। শোনা যায়, এর পর পরই পার্চমেন্ট শিল্পের বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়েছিল...
পাঁচ বছর পর উজিররা আবার প্রাসাদে মিলিত হলেন। ‘জাঁহাপনা, আপনার ইচ্ছা পূরণ করা হয়েছে। জানালা দিয়ে তাকান, দেখুন আপনার ঈপ্সিত...’
শাসক বিস্ময়ে চোখ ঘষলেন। প্রাসাদের সামনে উটের কাফেলা, আর তার শেষ প্রান্ত দিগন্তে অদৃশ্য। প্রতিটি উটের পিঠে দুটি বিশাল বোঝা। প্রতি বোঝায় মরক্কো বাঁধাই দশ খণ্ড বিপুলাকার গ্রন্থ।
‘এসব কী?’ সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন।
‘বিশ্ব ইতিহাস,’ জবাব দিলেন উজিরবৃন্দ। ‘আপনার আদেশে প্রাজ্ঞতমরা পাঁচ বছর এ জন্য দিনরাত শ্রম করেছেন!’
‘আমার সঙ্গে তামাশা?’ গর্জন করলেন সম্রাট। ‘সারা জীবনে আমি এর এক দশমাংশও পড়তে পারব না! তারা আমার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখুক। কিন্তু এতে সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী থাকা চাই।’
তিনি তাঁদের আরও এক বছর সময় মঞ্জুর করলেন। বছর শেষ হলো। প্রাসাদের সামনে আবার একটি কাফেলা। এবার উটের সংখ্যা দশ এবং উটপ্রতি বোঝা ও বইয়ের পরিমাণ আগের মতোই।
সম্রাট রেগে আগুন। ‘সর্বকালে সর্বজাতির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীই শুধু এরা লিখুক। কত সময় চাই তোমাদের?’
প্রাজ্ঞতমদের প্রধান এগিয়ে এসে বললেন, ‘জাঁহাপনা, শুধু একদিন, আগামীকালই আপনার আজ্ঞা পালিত হবে!’
‘আগামীকাল?’ বিস্মত সম্রাটের মুখে তাই প্রতিধ্বনিত হলো, ‘বহুৎ আচ্ছা, আমাকে ঠকানোর চেষ্টায় কিন্তু গর্দান নিশ্চিত।’
সবেমাত্র নীলাকাশে সূর্য উঠেছে, আর ফুলকুড়ির ঘুম টুটেছে। ঠিক তখনই সম্রাট প্রাজ্ঞতমকে তলব করলেন। প্রাজ্ঞতম ঘরে এলেন। হাতে তাঁর ছোট একটি চন্দনপেটিকা।
‘জাহাঁপনা, এরই মধ্যে সর্বকালে সর্বজাতির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী পাবেন,’ নত প্রাজ্ঞ বললেন।
সম্রাট বাক্সটি খুললেন। মখমলের গদিতে ছোট এক টুকরা কাগজ। এতে লেখা শুধু একটি বাক্যাংশ: ‘তারা জন্মেছিল, বেঁচেছিল এবং প্রয়াত হয়েছিল।’
এভাবেই প্রাচীন কাহিনীটি প্রচারিত। আর আমাদের যখন সীমিত পরিমাণ কাগজে (অর্থাৎ বইয়ের আয়তন সীমিত করে) রসায়ন সম্পর্কে একটি আকর্ষী বই লিখতে বলা হলো, তখন কাহিনীটি স্মরণ না করে উপায় ছিল না। এর অর্থ, আমরা সেরা ঘটনাগুলোই শুধু লিখতে পারব। কিন্তু রসায়নের সেরা বিষয় কোনগুলো?
‘রসায়ন—বস্তু ও তাদের রূপান্তরের বিজ্ঞান।’
0 মন্তব্যসমূহ